সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনযাপনের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমের কোনো বিকল্প নেই। ঘুম আমাদের দৈনন্দিন ক্লান্তি দূর করে, শরীর ও মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয় এবং নতুন শক্তি সঞ্চয় করতে সহায়তা করে। চিকিৎসকদের মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম প্রয়োজন। কিন্তু আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেকেই ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন।
অনেকে রাতে শুয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ঘুমাতে পারেন না, আবার কারও ঘুম আসে ভোরের দিকে। কেউ কেউ ঘুমানোর জন্য নিয়মিত ঘুমের ওষুধ গ্রহণ করেন। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, ঘুমের ওষুধে দীর্ঘদিন নির্ভরশীল হয়ে পড়া শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এটি শুধু স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ নষ্ট করে না, বরং শরীর ও মস্তিষ্কে নানা বিরূপ প্রভাব ফেলে।

অনিয়মিত ঘুমে যেসব রোগের ঝুঁকি বাড়ে
১. উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ
পর্যাপ্ত ঘুম না হলে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। ঘুমের সময় আমাদের হৃদ্পিণ্ড ও রক্তনালিগুলো বিশ্রাম পায়। কিন্তু ঘুম কম হলে হৃদ্পিণ্ডকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। ফলে ধীরে ধীরে কার্ডিওভাসকুলার সমস্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, যা একসময় হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
২. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
চিকিৎসকদের মতে, পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ‘লিভিং অর্গানিজম’ ও হরমোন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। এর ফলে হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, বিপাকক্রিয়া ও মানসিক স্থিতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৩. ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
দীর্ঘদিন রাতে কম ঘুমানো বা অনিয়মিত ঘুমের ফলে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদন ও কার্যকারিতা ব্যাহত হয়। এর ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয় এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
ঘুম হলো শরীরের ক্ষয়পূরণ ও শক্তি সঞ্চয়ের অন্যতম প্রধান উপায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন লিভিং অর্গানিজম সক্রিয়ভাবে কাজ করে। কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এসব উপাদান সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে, আর আমরা সহজেই নানা সংক্রমণ ও অসুখে আক্রান্ত হই।
৫. মানসিক সমস্যা ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হ্রাস
মস্তিষ্কে ওরেক্সিন (Orexin) নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোট্রান্সমিটার রয়েছে, যা আমাদের সজাগ থাকা, মনোযোগ ধরে রাখা ও মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ওরেক্সিন উৎপাদনের গতি কমে যায়। এর ফলে মনোযোগের ঘাটতি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, অবসাদ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
৬. হজমের সমস্যা
অনিয়মিত বা অপর্যাপ্ত ঘুমের কারণে হজমজনিত সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ঘুমের অভাবে শরীরের পাচনতন্ত্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে খাবার হজমে সহায়ক পাচক রসগুলো প্রয়োজনীয় মাত্রায় নিঃসৃত হয় না। এর ফল হিসেবে বদহজম, গ্যাস্ট্রিক, অম্বল ও পেটের নানা সমস্যা দেখা দেয়।

আমাদের দৈহিক ও মানসিক প্রায় সব কার্যকলাপই ঘুমের ওপর নির্ভরশীল। তাই ঘুমকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত প্রতিদিন অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সুস্থ শরীর, সতেজ মন ও দীর্ঘায়ু জীবনের জন্য নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমই হতে পারে সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর ওষুধ।